দেশে মৎস্য খাতে নতুন সম্ভাবনা, আর্টিমিয়া লবণের মাধ্যমে মৎস্য চাষের সাফলতা
খায়রুল আলম (সুমন) :
দেশে এখন থেকে একই সাথে আর্টিমিয়া ও লবণ উৎপাদন করা যায়। যা চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স ইনস্টিটিউটের গবেষকরা আর্টিমিয়া ও লবণের সমন্বিত চাষের নতুন এই সম্ভাবনা উন্মোচন করা হয়েছে। বিগত দিগুলোতে যা আলাদাভাবে চাষ করা হত।
সূত্রে জানা গেছে, আর্টিমিয়া এক ধরনের লবণজলীয় ক্ষদ্র প্রাণী। ওই ক্ষুদ্র প্রাণী দ্বারা মাছ ও চিংড়ির পোনা উৎপাদনে অত্যন্ত পুষ্টিকর জীবন্ত খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
গবেষকদের মতে উপকূলীয় অঞ্চলের লবণ চাষীরা একই স্থানে একই সাথে সমন্বিত পদ্ধতিতে আর্টিমিয়া এবং লবণ চাষ করে বেশি আয় করতে পারবেন। পাশাপাশি আর্টিমিয়া বায়োমাস ও সিস্ট উৎপাদনে দেশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। এতে করে আমাদের দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।
সমন্বিত আর্টিমিয়া চাষের মাধ্যমে আর্টিমিয়া বায়োমাস, সিস্ট, আটিমিয়া ফ্লেক ও গুণগতমান সম্পন্ন লবণ উৎপন্ন করা যায়। আর্টিমিয়া ফিল্টার ফিডার হিসেবে পানিতে দ্রবীভূত বর্জ্য আত্তীকরণ করার কারণে আর্টিমিয়া চাষে ব্যবহৃত লবণ পানি থেকে উৎপাদিত লবণ প্রচলিত পদ্ধতিতে
উৎপাদিত লবণের চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার ও অধিক গুণগত মানসম্পন্ন হয়। এটি নিয়ে গবেষকরা আশাবাদী যে স্থানীয় পর্যায়ে এই পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশ টেকসই মৎস্য উৎপাদনের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং ‘বু- ইকোনোমি’ বাস্তবায়নে ক্ষেত্রে আমাদের বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
উক্ত বিষয়ে একটি গবেষণা প্রকল্প সম্পন্ন করে ‘মাঠ পর্যায়ে আর্টিমিয়া ও লবণ এর সমন্বিত চাষ সহায়িকা’ নামের সহায়িকা প্রকাশ করা হয়েছে। সহায়িকতে আর্টিমিয়া কি, কেন এটি চাষ করা দরকার, কীভাবে লবণের সাথে একত্রে চাষ করলে উৎপাদন ও লাভ বাড়ে, এসব বিষয়ে উক্ত সহায়িকয় বিস্তারিত দিক নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। মাঠ বা পুকুর প্রস্তুতি, আর্টিমিয়ার খাদ্য, বায়োমাস ও সিস্ট সংগ্রহ, লবণ উৎপাদন, ফ্লেক ফিড প্রস্তুত, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের ধাপও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে উক্ত সহায়িকাটিতে।
গবেষকদের মতে আটিমিয়া ও লবণ চাষ হল একটি সমন্বিত কৃষি পদ্ধতি, যেখানে লবণ চাষের জমিতেই আর্টিমিয়া চাষ করা সম্ভব। এই পদ্ধতি লবণ চাষীদের আর্থিক লাভকে বাড়িয়ে বিকল্প আয়ের একটি পথ খোলা সম্ভব হয়। এতে একদিকে আমদানি নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে লবণ মাঠগুলোর বিকল্প ব্যবহার বাড়বে। ফলে এটি উপকূলীয় অঞ্চলে আয় বাড়াবে এবং টেকসই মৎস্যখাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলেও গবেষকদের ধারণা।
আমাদের দেশের কৃত্রিম মৎস্য, চিংড়ি প্রজনন ও উৎপাদন কেন্দ্রসমূহে আর্টিমিয়ার ব্যাপক চাহিদা আছে। কিন্তু এর পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। লবণাক্ত পানিতে উৎপাদিত আর্টিমিয়া জীবন্ত অবস্থায় যেমন চিংড়ি কিংবা মাছকে খাওয়ানো যায়, তেমনি প্রাপ্তবয়স্ক আর্টিমিয়ার বায়োমাস ব্যবহার করে পরবর্তীতে খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্য আর্টিমিয়া ফ্লেকও তৈরি করা যায়। উৎপাদিত আর্টিমিয়া ফ্লেক ও সিস্ট প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে সারাবছর ব্যবহার করা যায়। ওই পদ্ধতিতে সারা বছরব্যাপী উৎপাদন করতে চাইলে সাশ্রয়ী মূল্যে শেড নির্মাণ করে লবণ মাঠে সহজলভ্য প্রযুক্তিতে আর্টিমিয়া বায়োমাস, সিস্ট ও লবণ উৎপাদন করা সম্ভব।
আর্টিমিয়া থেকে বায়োমাস ও সিস্ট উৎপাদন এবং সেই বায়োমাস থেকে আর্টিমিয়া ফ্লেক তৈরি করা, যা মাছ ও চিংড়ির পোনা উৎপাদনে ব্যবহার করা যাবে। পাশাপাশি চাষীদের আয় বৃদ্ধি এবং লবণের গুণগত মানও উন্নয়ন করা যায় এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সিস্ট, বায়োমাস ও ফ্লেক কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রগুলো সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং চাষীদের জীবনমান উন্নত হবে।
দেশের সরকারি ও বেসরকারি উদ্ধ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করলে কৃষক ও লবণচাষীরা বাণিজ্যিকভাবে এই পণ্য বাজারজাত করতে পারবেন। সরকারি প্রণোদনা পেলে এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মতো স্থানীয় পর্যায়ে বায়োমাস, সিস্ট ও ফ্লেক উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে পারলে এটি সম্ভাবনাময় বিরাট একটি শিল্পে পরিণত করা যাবে।