হলফনামা: সিলেট-৩
সম্পদে রাজা মোস্তাকিম, মামলায় লোকমান-নির্ভার মালিক
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে মাঠে নেমেছেন নয়জন প্রার্থী। ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও শিক্ষকতায় থাকা ব্যক্তিরা জনপ্রতিনিধি হতে নেমেছেন ভোটযুদ্ধে। সম্পদ, আয়, মামলা ও শিক্ষাগত যোগ্যতায় নয় প্রার্থীর মধ্যে রয়েছে বৈচিত্র্যতা।
একদিকে বিপুল সম্পদের মালিক ও উচ্চশিক্ষিত প্রার্থী, অন্যদিকে মামলার ভারে জর্জরিত কিংবা ন্যূনতম আয়ের স্বশিক্ষিত প্রার্থী-সব মিলিয়ে এই আসনে ভোটের লড়াই শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নেই। বরং আর্থিক সক্ষমতা, আইনগত অবস্থান ও শিক্ষাগত যোগ্যতার বিচারেও হবে লড়াই।
কারও নামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ ও লাখ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা, আবার কারও ঝুলিতে নেই নিজ নামে কোনো স্থাবর সম্পদ। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেওয়া প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য বলছে, সম্পদের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী। এলএলবি ডিগ্রিধারী এই ব্যবসায়ীর বার্ষিক আয় ৪ কোটি ৮২ লাখ টাকার বেশি। তার নিজ নামে অস্থাবর সম্পদ ৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১০ কোটি টাকা। স্ত্রী ও নির্ভরশীলদের নামেও রয়েছে স্থাবর সম্পদ।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন প্রবাসী মোহাম্মদ আব্দুল মালিক। স্বশিক্ষিত হলেও তার ও স্ত্রীর নামে অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—স্ত্রীর নামে রয়েছে ৬ লাখ পাউন্ড বৈদেশিক মুদ্রা।
এছাড়া দিলওয়ার হোসাইন, মুসলেহ উদ্দিন রাজু ও মাইনুল বাকর—এই তিন প্রার্থীর নিজ নিজ নামে উল্লেখযোগ্য স্থাবর সম্পদ রয়েছে, যার পরিমাণ ৫০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকার মধ্যে। সবচেয়ে কম সম্পদের মালিক রেদওয়ানুল হক চৌধুরী। তার অস্থাবর সম্পদ মাত্র ৪ লাখ ১৬ হাজার টাকা, আর নিজ নামে কোনো স্থাবর সম্পদ নেই।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ‘নির্যাতিত’ সিলেট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল মালিক। দীর্ঘ ১৯ বছর পর দেশে মালিক নির্ভার। তার বিরুদ্ধে একটিও মামলা নেই। তবে মামলার বোঝায় পিষ্ট জামায়াতের প্রার্থী লোকমান আহমদ। তার ঘাড়ে রয়েছে ১৩টি মামলা। সবকটিই এখনও চলমান। এছাড়া মোহাম্মদ আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে ২টি এবং দিলওয়ার হোসাইনের বিরুদ্ধে ১টি মামলা রয়েছে। বাকি প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলার তথ্য উল্লেখ নেই।
বার্ষিক আয়ে সবার চেয়ে উপরে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যরিস্টার মোস্তাকিম রাজা। তার বার্ষিক আয় চার কোটি ৮২ লাখ ৭০ হাজার ৩৯৪ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আতিকুর রহমান। তার বার্ষিক আয় ১৯ লাখ ১০ হাজার টাকা। এছাড়াও খেলাফত মজলিসের দিলোওয়ার হোসেনের ১৬ লাখ ৯৩ হাজার ২৩০ টাকা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দিন রাজুর ১২ লাখ ২৫ হাজার টাকা, বিএনপির মোহাম্মদ আব্দুল মালিকের ৯ লাখ ১৬ হাজার টাকা ৫০০ টাকা, এনসিপির প্রার্থী নুরুল হুদা জুনেদের ৬ লাখ টাকা, জামায়াতের প্রার্থী লোকমান আহমদের ৫ লাখ টাকা, স্বতন্ত্র প্রার্থী মাইনুল বাকরের ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী রেদওয়ানুল হক চৌধুরীর ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
সিলেট-৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী ৯ প্রার্থীর মধ্যে শুধুমাত্র বিএনপির আব্দুল মালিক ও মাইনুল বাকের স্বশিক্ষিত। বাকি সাতজনই উচ্চ শিক্ষিত। ৯জনের মধ্যে পাঁচজন ব্যবসায়ী, দুইজন প্রবাসী, একজন আইনজীবি ও একজন শিক্ষক রয়েছেন।
শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে নুরুল হুদা জুনেদ। তিনি এলএলএম ডিগ্রিধারী এবং বর্তমানে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কর্মরত। এরপর রয়েছেন মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী (এলএলবি) ও মোহাম্মদ আতিকুর রহমান (বিএসসি)।
ধর্মীয় শিক্ষায় উচ্চতর যোগ্যতা রয়েছে কয়েকজন প্রার্থীর। রেদওয়ানুল হক চৌধুরী (তাকমিল ফিল হাদিস), দিলওয়ার হোসাইন (তাকমীল) এবং মুসলেহ উদ্দিন রাজু (দাওরাহে হাদিস)—এই তিনজন ইসলামি শিক্ষায় উচ্চস্তরের ডিগ্রিধারী। অন্যদিকে মোহাম্মদ আব্দুল মালিক ও মাইনুল বাকর স্বশিক্ষিত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।
হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাকিম রাজা চৌধুরীর অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ৩ কোটি ৬৩ লাখ ৫১ হাজার ৬১ টাকার। নিজ নামে স্থাবর সম্পদ রয়েছে ১০ কোটি টাকার। এছাড়াও তার স্ত্রীর নামে স্থাবর সম্পদ রয়েছে ৩০ লাখ টাকার।
জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আতিকুর রহমানের অস্থাবর সম্পদ রয়েছে এক কোটি ১৭ লাখ ১৯ হাজার ১৬৩ টাকার। তার স্ত্রীর নামে অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ৬২ লাখ ৪৫ হাজার টাকার। এছাড়াও আতিকুর রহমানের নিজের নামে স্থাবর সম্পদ রয়েছে ১ কোটি ০৬ লাখ ৮৮ হাজার ৫২৫ টাকার। তার স্ত্রীর ৬৮ লাখ ৮২ হাজার ৫২৫ টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে।
তাছাড়াও দিলওয়ার হোসাইনের ১ কোটি ৫৬ লাখ ৪৮ হাজার ৯৯২ টাকার অস্থাবর সম্পদ ও দেড়কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে। তার স্ত্রীর নামেও রয়েছে আড়াই লাখ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ।
পেশায় শিক্ষক রেদওয়ানুল হক চৌধুরীর ৪১ লাখ ৬ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। তার কোনো স্তাবর নেই। লোকমান আহমদের ২১ লাখ টাকার অস্থাবর ও ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে।